1. admin@swapno.info : admin :
  2. info.popularhostbd@gmail.com : PopularHostBD :
বাংলার আপেল বরিশালের পেয়ারা | স্বপ্ন ইনফো
bn Bengali
bn Bengalien English
November 24, 2020, 6:31 pm

বাংলার আপেল বরিশালের পেয়ারা

বর্না,এডিটর,স্বপ্ন ইনফো
  • Update Time : Saturday, July 11, 2020
  • 119 Time View

কৃষিবিদ জাহেদুল আলম রুবেলঃ আমরা পেয়ারা বেচি ৫-৬ টাকা কেজি। সেই পেয়ারা ঢাকায় কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। এক মন পেয়ারা বেচে পাঁচ কেজি চালও মিলেনা।’ কথাগুলো বলছিলেন ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভীমরুলী গ্রামের পেয়ারা চাষী অজিত দুয়ারি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় পেয়ারা পুষ্টিমান সমৃদ্ধ বলে একে বাংলার আপেল বলা হয়। ঝালকাঠির চাষীরা এই পেয়ারা প্রায় শত বছর ধরে চাষ করে আসছেন। সদর উপজেলার কৃত্তিপাশা, ভীমরুলী, শতদাসকাঠি, খাজুরা, মিরাকাঠি, ডুমুরিয়া, জগদিশপুর, খোদ্রপাড়া, পোষন্ডা, হিমানন্দকাঠি, বেতরা, কাপড়কাঠি ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানার বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে পেয়ারা বাগান। শত শত হেক্টর জমিতে প্রতি বছর পেয়ারা উৎপাদিত হয়। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানকার পেয়ারা বাজারজাত করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে নৌপথ। তাই প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীমরুলীর খালে বসে ভাসমান পেয়ারার হাট। ছোট ছোট নৌকায় করে চাষীরা বাগান থেকে ভাসমান হাটে নিয়ে আসেন পেয়ারা। পাইকাররা এই পেয়ারা কিনে ট্রলারে করে নিয়ে যান দেশের বিভিন্নস্থানে। শুধু পেয়ারা কিনতে নয়, বিশাল বাগান আর পেয়ারার এই ভাসমান হাট দেখতে পর্যটকরাও ঘুরতে আসেন এখানে।

ছবিঃ আরিফ রহমান

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চাষীদের পক্ষে দ্রুত পচনশীল এ ফল ঢাকা, চট্টগ্রামের মত বড় শহরে নিয়ে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই স্থানীয় বাজারে পাইকারদের কাছে নামমাত্র মূল্যে পেয়ারা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এ কারণে মধ্যস্বত্বভোগীরা বিনাশ্রমে বিপুল পরিমাণ মুনাফা পাচ্ছে। অন্যদিকে সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করেও পেয়ারা চাষীরা সাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পারছেন না।
কাপড়কাঠি গ্রামের পেয়ারা চাষী পরিতোষ বেপারী বলেন, ‘আমার দেড় একর জমিতে পেয়ারার বাগান রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের ১ তারিখ পর্যন্ত আমি দুই লাখ ৮০ হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রি করেছি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল থাকলে পেয়ারা বিভিন্নস্থানে পাঠাতে পারতাম। তাহলে আরো বেশি লাভবান হতে পারতাম।’

শতদশকাঠি গ্রামের বিপুল হালদার বলেন, ‘আমার এক একর ২৫ শতাংশ জমিতে পেয়ারার বাগান রয়েছে। ফলনও ভাল হয়েছে। মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে পেয়ারার চাষ করেছি। স্থানীয় বাজারে পেয়ারা পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরা পেয়ারা মহাজনদের কাছে বিক্রি করি। মহাজনরা দেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এতে মধ্যসত্বভোগী মহাজন ও পাইকাররা লাভবান হচ্ছেন।’

পেয়ারা চাষী ভবেন্দ্রনাথ হালদার বলেন, ‘প্রাণ কোম্পানি জেলি তৈরির জন্য এ বছর চাষীদের কাছ থেকে কিছু পেয়ারা কিনেছে। প্রতিবছর বড় বড় কম্পানিগুলো যদি জেলি তৈরির জন্য এখান থেকে পেয়ারা কিনতো তাহলে আমরা বেশি লাভবান হতাম। আর সবচেয়ে ভাল হতো ভীমরুলী গ্রামে জেলি কারখানা স্থাপন করলে।’
ভীমরুলী গ্রামের পেয়ারার আড়তদার (মহাজন) লিটন হালদার বলেন, ‘সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করেও পেয়ারা চাষীরা ঋণের বোঝা মুক্ত হতে পারছেন না। দারিদ্র্য আঁকড়ে ধরেছে তাদের জীবনযাত্রাকে। আমরা যতটা পারি তাদের সহায়তা করি।’

ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রাসারণ বিভাগের উপ পরিচালক মো. আ. আজিজ ফরাজি বলেন, ‘কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পেয়ারা চাষীদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এ বছর ৬৫০ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। গড়ে আমরা ৮ টন করে ফলন পেয়েছি। তবে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে চাষীরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না।’
বাংলার আপেল ফরমালিনের ঝাঁজে বাজারের ফলে হাত দেওয়ার জোঁ নেই। যত ফল বাজারে মেলে তার কোনটিতে ফরমালিন নেই, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। তবে বাজারের একমাত্র ফল বাংলার আপেল খ্যাত বরিশালের পেয়ারা, যাতে ফরমালিন মেশানো হয় না! ফলটির আঞ্চলিক নাম ‘গইয়া বা গয়া’। বৈজ্ঞানিক নাম চংরফরঁস মঁধলধাধ. পেয়ারার রয়েছে ১০০টির মতো প্রজাতি। পেয়ারা কম বেশী সারা বছর দেশের বিভিন্ন বাজারে পাওয়া যায়। ফলটি খেতে যেমনি সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিগুণে তুলনাহীন। দেশের অন্যসব এলাকার উৎপাদিত পেয়ারার চেয়ে বরিশাল অঞ্চলে উৎপাদিত পেয়ারার রয়েছে সুনাম। এ অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে বরিশালের পেয়ারা বিদেশ পাড়িও দেয়।

ছবিঃ আরিফ রহমান

বরিশাল বিভাগের সব স্থানে পেয়ার ফলন হলেও উন্নত ও সুস্বাদু পেয়ারা বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে উৎপাদন হয়। তাই ওই তিন জেলাকে বলা হয় ‘পেয়রা রাজ্য’। পেয়ারা মৌসুমের তিন মাস পাকা পেয়ারার মৌ মৌ গন্ধে ৫৬টি গ্রামের বাতাস সুরভিত থাকে। বাগানে ১২ মাস পেয়ারার ফলন হলেও মুলত পেয়ারা মৌসুম বলতে বুঝায় আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র এই তিন মাস।

পেয়ারা চাষী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিলন পাইক জানান, গুণগত মানের দিক থেকে আপেলের চেয়ে পেয়ারা উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু। কিন্তু দ্রুত পচনের কারণে পেয়ারা চাষিরা পড়ে বিপাকে। স্বরূপকাঠী, ঝালকাঠি ও বানারীপাড়ার সহাস্রাধিক পেয়ারা চাষী ও পাইকার বাগানের ফলন নিয়ে থাকেন আতংকে। সংরক্ষণের অভাবে উৎপাদিত পেয়ারার প্রায় অর্ধেকটাই পচে বাগানে নষ্ট হয়। তাই পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য এ অঞ্চলের মধ্যভাগের যে কোনো স্থানে একটি জেলি কারখানা তৈরীর দাবি করেছে পেয়ারা চাষীরা।

বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে অতিরিক্ত পরিচালক মো. মজিবুল হক মিয়া বলেন, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় চলতি বছর তিন হাজার ১৮৩ হেক্টর জমিতে পেয়ারার আবাদ হয়েছে। ওই পরিমাণ জমিতে ২৪ হাজার ৯৭০ মেট্রিক টন পেয়ারা উৎপাদান হয়েছে। উৎপাদিত পেয়ারার বাজার মূল্য প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। উৎপাদিত পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণসহ জেলি কারখানা স্থাপন করলে চাষি ও বাগান মালিকরা উপকৃত হবে। পাশাপশি শিল্প উদ্যেক্তারাও হবেন লাভবান।

পুষ্টিগুনঃ পেয়ারা ভিটামিন সি, ক্যারোটিনয়েডস, ফোলেট, পটাশিয়াম, আঁশ এবং ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ ফল। ১০০ গ্রাম পেয়ারায় ২০০ মিলিগ্রাম ভিটামনি সি আছে অর্থাৎ পেয়ারা কমলার চেয়ে চারগুণ বেশী ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। পেয়ারার খোসায় কমলার চেয়ে পাঁচগুণ বেশী ভিটামিন সি থাকে। এই ফলে লৌহ উপাদানও পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান। পেয়ারাতে প্রচুর পরিমাণে এন্টিঅক্সিডেন্ট ও পলিফেনল আছে যা ক্যান্সার প্রতিরোধক। ১০০ গ্রাম পেয়ারায় পানি ৮৬.১০ গ্রাম, শক্তি ৫১ কিলো ক্যালোরী, প্রোটিন ০.৮২ গ্রাম, আঁশ ৫.৪ গ্রাম, ফসফরাস ২৫ মিলি গ্রাম, সোডিয়াম ৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন এ ৭৯২ আই ইউ থাকে। এছাড়া পেয়ারাতে ম্যাঙ্গানিজ, সেলিনিয়াম, ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৩ ইত্যাদি মূল্যবান খনিজ ও ভিটামিন থাকে। রোগ প্রতিরোধে পেয়ারার রয়েছে বহু গুণ। পেয়ারার বীজে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ পলিআন-সেচুরেটেড ফ্যাটি এসিড ও আঁশ বিদ্যমান। পেয়ারা পাতার রস ক্যান্সার প্রতিরোধী এবং সংক্রমণ, প্রদাহ, ব্যথা জ্বর, বহুমূত্র, আমাশয় ইত্যাদি রোগে ব্যবহƒত হয়ে থাকে।

সংরক্ষণ নিয়েই যত দুচিন্তাঃ পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানায় এবারও হয়েছে পেয়ারার বাম্পার ফলন। স্থানীয় বাজারে জায়গা দখল করে আছে দেশী পেয়ারা। এ ছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে পেয়ারা। কিন্তু মৌসুমের শুরু থেকেই পেয়ারার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে এ উপজেলার হাজার হাজার চাষি মুনাফা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই অঞ্চলের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সংরক্ষণের অভাবকেই প্রধানত দায়ি করছেন চাষিরা। যুগ যুগ ধরে এ এলাকা পেয়ারার জন্য বিখ্যাত হলেও লাখ লাখ টন পেয়ারা উৎপাদন করেও ভাগ্য বদল হয়নি চাষিদের।

চাষিরা জানান, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগ থাকলে মৌসুমি এ ফল পেয়ারা বছরজুড়ে ভোক্তাদের চাহিদা মেটাতে পারত। এ থেকে উৎপাদিত জ্যাম-জেলি দেশী বাজারে চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতো। কিন্তু ৫০ বছরেও পেয়ারা উৎপাদনকারি এ অঞ্চলে পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য গড়ে ওঠেনি কোন হিমাগার বা জেলি প্রস্তুত কারখানা।

এ ব্যপারে চাষি নারায়ন চন্দ্র মন্ডল বলেন, এলাকার অর্ধশত গ্রামের চাষি যুগ যুগ ধরে পেয়ারা চাষ করে আসছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও উদ্যোক্তার অভাবে হিমাগারসহ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প নির্মিত না হওয়ায় চাষিরা পেয়ারা চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন। চাষিরা এ প্রতিবেদককে জানান, উপজেলার অন্যতম পেয়ারা বাগান আটঘর-কুড়িয়ানাসহ এ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৬৪৫ হেক্টর জমিতে পেয়ারা চাষ হচ্ছে। এছাড়া ২ হাজার ২৫টি পেয়ারা বাগানের সঙ্গে জড়িত রয়েছে আরও ১হাজার ২৫০জন চাষী। আর পেয়ারার চাষাবাদ ও বিপনন ব্যবস্থার সঙ্গে ওই সময় এলাকার প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে রয়েছে।

জিন্দাকাঠি গ্রামের চাষি গোকুল চন্দ্র মজুমদার জানান, কয়েক বছরের তুলনায় এ মৌসুমে পেয়ারার বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদিত পেয়ারার দাম তুলনামূলক কম। কিন্তু পেয়ারা বাগান পরিচর্যাসহ শ্রম মজুরি বেশী হওয়ায় চাষীরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন বেশী হচ্ছে।

আন্দাকুল গ্রামের চাষি গোপাল চন্দ্র মন্ডল জানান, কৃষি ঋণ পেতে তাদের বিভিন্ন সময়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। তাদের দাবি, চাষীদের আর্থিক সহায়তায় সহজ শর্তে শুধু পেয়ারা চাষাবাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হোক। ওই এলাকার পেয়ারা ও আমড়া চাষি সমিতির সহ-সভাপতি দীনেষ মন্ডল জানান, স্বরূপকাঠি থেকে পেয়ারা বাজারজাত করতে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয় পেয়ারা চাষিদের। আটঘর-কুড়িয়ানার ইউপি সদস্য বাবুল মন্ডল জানান, সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে বৃহৎ কোন হিমাগার বা জেলী তৈরির শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে পেয়ারা চাষীরা একদিকে যেমন ন্যায্য মূল্য পেত তেমনি উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নিতে পারত।
এ ব্যাপারে এনজিও ফোরামের সভাপতি জিয়াউল আহসান বলেন, বহুবার সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি হিমাগার ও জ্যাম-জেলি পস্তুত কারখানার প্রস্তাব দিয়েও কোন লাভ হয়নি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category